মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

শৃঙ্খলা ফেরাতে না পেরে সচল বৈছাআর স্থগিত কমিটি!

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর গত ২৭ জুলাই দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) সব কমিটি স্থগিত করেছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তবে হঠাৎ করেই গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে সংগঠনটির সব কার্যক্রম ফের সচল করার ঘোষণা দেওয়া হয়, যা নিয়ে সংগঠনটির ভেতরে প্রশ্ন ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি জাতীয় ছাত্রশক্তির নতুন কমিটি গঠনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষপর্যায়ে দ্বন্দ্ব ও অনৈক্য তৈরি হয়। এর জেরেই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সব কমিটি সচল করার ঘোষণা আসে। অন্যদিকে, কমিটি পুনর্বহালের ঘোষণার পর সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনামসহ বিভিন্ন ইউনিটের সাত নেতা এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সব কমিটির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, ২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের শহীদ পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যেমন নিশ্চিত করা হয়নি, তেমনি তাদের নিরাপত্তাও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সরকার।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণের নিমিত্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মহানগর, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সব ইউনিট কমিটির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলো। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে সাংগঠনিক কার্যক্রম ফের সচল করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও জেলা ইউনিটকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটি পুনর্গঠন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।’

এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনাম পদত্যাগ করেন। জানা যায়, কমিটি পুনর্বহালে হাসান ইনামের কোনো সম্মতি ছিল না। একই সঙ্গে কমিটিগুলো পুনর্বহাল করায় বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও ফের এ পরিচয় ব্যবহার করবেন। তাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফের বিতর্কিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সংগঠনের সাবেক নেতাদেরও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে দেখা গেছে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, মূলত জাতীয় ছাত্রশক্তির কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেই কমিটি সচল করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈছাআর সভাপতি রিফাত রশিদ ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে আসতে পারেন এমন গুঞ্জন ছিল। যদিও সেটি শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। অন্যদিকে বাগছাসের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদেরকে কোথাও না রাখার সিদ্ধান্তও এনসিপির হাইকমান্ডের একটি অংশ ভালোভাবে নেননি। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সমাধান না আসায় ছাত্রশক্তির বিকল্প হিসেবে বৈছাআর সব কমিটি সচল করা হয়। ছাত্রশক্তিতে জায়গা না পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কেউ সাধারণ সম্পাদকের শূন্য পদের দায়িত্বে আসতে পারেন বলেও জানা গেছে।

পদত্যাগ করা এক নেতা কালবেলাকে বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগে যে কমিটি স্থগিত করা হয়েছে, সেটা কোনো আলোচনা ছাড়াই সচল করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া অনেক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ আছে, কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই তাদের পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। জাতীয় ছাত্রশক্তির অনৈক্যকে মূলত এখানে টেনে আনা হয়েছে।’

চাঁদাবাজির অভিযোগে বাতিল হওয়া কমিটিগুলো আবারও পুনর্বহালের প্রতিবাদ জানিয়ে এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন ইউনিটের অন্তত সাতজন নেতা। গত রোববার রাতে ও গতকাল সোমবার পৃথকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তারা। পদত্যাগী নেতারা হলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ইনামুল হাসান (হাসান ইনাম), সহ-দপ্তর সম্পাদক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিয়াম আন নুফাইস, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) শাখার সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম, ফরিদপুর জেলার মুখপাত্র কাজী জেবা তাহসিন, কুড়িগ্রাম জেলার মুখ্য সংগঠক সাদিকুর রহমান, লক্ষ্মীপুর জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক রেদওয়ান হোসাইন রিমন, চান্দিনা উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব ও কুমিল্লা জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু হানিফ।

হাফিজুল ইসলাম তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, ‘আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। তবে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে মনে হয়েছে, তাদের আগের লক্ষ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আগামী দিনের লক্ষ্য কী হবে—তা বোধগম্য নয়। আমি মনে করছি, যে লক্ষ্য নিয়ে কমিটিগুলো গঠিত হয়েছিল, সেসব লক্ষ্য পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলা শাখার মুখপাত্র কাজী জেবা তাহসিন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগের ঘোষণায় জেবা তাহসিন লিখেছেন, ‘এই পদ থেকে সরে গেলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি আমার ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা আগের মতোই অটুট থাকবে। আমি সবসময় এ আন্দোলনের পথে থাকব, হয়তো ভিন্ন ভূমিকায়, কিন্তু একই লক্ষ্য নিয়ে; বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্নে।’

সহ-দপ্তর সম্পাদক সিয়াম আন নুফাইস পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, তবে ব্যক্তিগত কিছু কারণে এ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংগঠনের প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অটুট থাকবে এবং ভবিষ্যতেও সংগঠনের কল্যাণে নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার চেষ্টা করবেন।

লক্ষ্মীপুর জেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রেদওয়ান হোসাইন রিমন পদত্যাগ করেছেন। রোববার রাত ১টার দিকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। ওই পোস্টে রিমন লেখেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গর্বের প্ল্যাটফর্ম। এটা কারও ব্যক্তিগত সংগঠন নয়, এটা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার সংগঠন। এটা বিপ্লবীদের সংগঠন; কিন্তু একটা গোষ্ঠী রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্মকে আজকে হাসির পাত্রে পরিণত করেছে।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো সংবাদ